সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসির আগের দিনগুলো!

সাদ্দাম হোসেন তিন দশক তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাকের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শক্তিশালী এই নেতা সেই নেতৃত্বে সফলতা অর্জন করলেও, চরম নিষ্ঠুরতারও অভিযোগ আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। আর সেই অভিযোগের কারণ দেখিয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ৩০ ডিসেম্বর সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসি দেয়।

 

ফাঁসির আগে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের একটি কারাগারে বন্দি ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম। উইল বার্ডেনওয়ারপার নামের এক কারারক্ষী সাদ্দাম হোসেনের জীবনের শেষ কয়েকদিনের অজানা কিছু ঘটনা নিয়ে লিখেছেন ‘দ্য প্রিজনার ইন হিজ প্যালেস : সাদ্দাম হোসেন, হিজ আমেরিকান গার্ডস অ্যান্ড হোয়াট হিস্টোরি লিভস আনটোল্ড’ নামে একটি বই। মার্কিন ৫৫১ নম্বর মিলিটারি পুলিশ কোম্পানির ১২ জন সেনাসদস্যকে ‘সুপার টুয়েলভ’ বলে ডাকা হতো, তারাই কারাগারে সাদ্দামের পাহারাদার হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এই আর্টিকেলটিতে সাদ্দামের জীবনের শেষ দিনগুলো কিভাবে কেটেছিল তারই কিছু তথ্য  দেয়া হয়েছে, সেনাবাহিনীদের অভিজ্ঞতার আলোকে।

 

প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম
প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম

 

১। বার্ডেনওয়ার্পার তাঁরই এক সেনা-সঙ্গী রজারসনকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, আমরা কখনও সাদ্দামকে মানসিক বিকারগ্রস্ত হত্যাকারী হিসাবে দেখিনি। তাঁর দিকে তাকালে নিজের দাদুর মতো লাগত অনেক সময়ে।

 

২। ইরাকের জেলে জীবনের শেষ সময়টুকু কাটানোর সময়ে সাদ্দাম হোসেন আমেরিকান গায়িকা মেরি জে ব্লাইজার গান শুনতেন নিয়মিত।

 

৩। নিজের এক্সারসাইজ বাইকে চড়তে পছন্দ করতেন সাদ্দাম। ওটার নাম দিয়েছিলেন ‘পনি’।

 

৪। মিষ্টি খেতে খুব ভালবাসতেন। মাঝে মধ্যেই মাফিন খেতে চাইতেন।

 

৫। সাদ্দামের ‘কোহিবা’ সিগার খাওয়ার খুব নেশা ছিল। মনে করা হয় কিউবার সিগারের মধ্যে এই ‘কোহিবা’ সবার চেয়ে সেরা সিগার গুলোর অন্যতম।ভেজা ওয়াইপে জড়িয়ে একটা বাক্সের মধ্যে রাখা থাকত সিগার গুলো। সাদ্দাম নিজেই বলেছিলেন যে বহু বছর আগে ফিদেল কাস্ত্রো তাকে সিগার খাওয়া শিখিয়েছিলেন।

 

৬। সিগার ছাড়াও বাগান করা আরেকটা শখ ছিল সাদ্দাম হোসেনের। জেলের ভেতরে অযত্নে ফুটে থাকা জংলী ঝোপ -ঝাড় গুলোকেও তিনি একটা সুন্দর ফুলের মতো মনে করতেন। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে খুবই সংবেদনশীল ছিলেন সাদ্দাম, সকালের নাস্তাটা তিনি কয়েকটা ভাগে খেতেন – প্রথমে অমলেট, তারপর মাফিন আর শেষে তাজা ফল।ভুল করেও যদি তাঁর অমলেটটা টুকরো হয়ে যেত, সেটা তিনি খেতেন না ।

 

৭। একবার সাদ্দাম তার ছেলে উদয় কতটা নিষ্ঠুর ছিল, সেটা বোঝাতে গিয়ে বীভৎস একটা ঘটনার কথা বলেছিলেন। ওই ব্যাপারটায় সাদ্দাম প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলেন। উদয় কোনও একটা পার্টিতে গিয়ে গুলি চালিয়ে দিয়েছিল – তাতে বেশ কয়েকজন মারা গিয়েছিলেন। গুলিতে আহত হয়েছিলেন আরও কয়েকজন।

 

৮। সাদ্দাম ব্যাপারটা জানতে পেরে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে উদয়ের সবক’টা গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিতে। তার মধ্যে রোলস রয়েস, ফেরারি, পোর্শা গাড়িও ছিল।

 

৯। সাদ্দাম হোসেনের নিরাপত্তার জন্য নিযুক্ত আমেরিকান সেনারাই তাঁকে একদিন জানিয়েছিলেন যে তাঁর ভাই মারা গেছেন। যে সেনাসদস্য খবরটা দিয়েছিলেন, সাদ্দাম তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, আজ থেকে তুমিই আমার ভাই।

 

১০। আরেকজন প্রহরীকে বলেছিলেন, যদি আমার সম্পত্তি ব্যবহার করার অনুমতি পাই, তাহলে তোমার ছেলের কলেজে পড়তে যা খরচ লাগবে, সব আমি দিতে রাজী।

 

নিজের শাসন আমলে সাদ্দাম
নিজের শাসন আমলে সাদ্দাম

 

১১। এক রাতে বছর কুড়ি বয়সের সেনা প্রহরী ডসন বাজে মাপে কাটা একটা স্যুট পড়ে ঘুরছিল। জানা গেল যে ডসনকে ওই স্যুটটা সাদ্দাম উপহার হিসাবে দিয়েছেন।

 

১২। বার্ডেনওয়ার্পারের কথায়, বেশ কয়েকদিন আমরা সবাই ডসনকে নিয়ে হাসাহাসি করছিলাম ওই স্যুটটার জন্য। ওটা পড়ে ও এমন ভাবে হাঁটাচলা করত, যেন মনে হতো কোনও ফ্যাশন শো’য়ে ক্যাটওয়াক করছে ডসন।

 

১৩। সাদ্দাম আর তাঁর প্রহরীদের মধ্যে বন্ধুত্ব বেশ ঘন হয়ে উঠছিল, যদিও তাদের ওপরে কড়া নির্দেশ ছিল যে সাদ্দামের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টাও যেন কেউ না করে।

 

১৪। সাদ্দাম হোসেনকে মামলা চলা চলার সময় দুটো জেলে রাখা হয়েছিল। এক জেল ছিল আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের কয়েদখানা, আর অন্যটা উত্তর বাগদাদের সাদ্দামেরই একটা প্রাসাদে। ওই প্রাসাদটা ছিল একটা দ্বীপে। একটা সেতু পেরিয়ে ওই দ্বীপে যেতে হতো।

 

১৫। আমরা অবশ্য সাদ্দামকে এমন কিছু দিইনি, যেটা তিনি পাওয়ার অধিকারী ছিলেন না। কিন্তু ওঁর অহংবোধে কখনও আঘাত করতাম না আমরা – লিখছেন বার্ডেনওয়ার্পার।

 

১৬। স্টিভ হাচিনসন, ক্রিস টাস্করের মতো কয়েকজন প্রহরী ওই প্রাসাদেরই একটা স্টোর রুমে সাদ্দামের দপ্তর তৈরি করে দিয়েছিল।

 

১৭। সাদ্দাম হোসেনকে একটা চমক দেওয়ার ইচ্ছা ছিল সবার।পুরনো, ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র থেকে একটা ছোট টেবিল আর চামড়ার ঢাকনা দেওয়া একটা চেয়ার নিয়ে আসা হয়েছিল। টেবিলের ওপরে ইরাকের একটা ছোট পতাকাও রাখা হয়েছিল।

 

১৮। আমরা চেষ্টা করেছিলাম জেলের ভেতরেই সাদ্দামের জন্য শাসনকাজ পরিচালনার মতো একটা অফিস তৈরি করতে। যখন সাদ্দাম ওই ঘরটায় প্রথমবার গিয়েছিলেন, একজন সেনা সদস্য হঠাৎই খেয়াল করে যে টেবিলের ওপরে ধুলো জমে আছে। সে ধুলো ঝাড়তে শুরু করেছিল।  ওই আচরণটা সাদ্দামের নজর এড়ায়নি। চেয়ারে বসতে বসতে তিনি মুচকি হেসেছিলেন।

 

১৯। তারপর থেকে তিনি রোজ ওই চেয়ারে এসে বসতেন। তাঁর নিরাপত্তার জন্য নিযুক্ত সেনাপ্রহরীরা সবাই সামনের চেয়ারগুলোতে বসতেন। যেন সাদ্দাম নিজের দরবারে বসেছেন।

সাদ্দাম হোসেইন এর উক্তি
সাদ্দাম হোসেইন এর উক্তি

 

২০। নিরাপত্তা রক্ষীরা চেষ্টা করত সাদ্দামকে খুশী রাখতে। তার বদলে সাদ্দামও সকলের সঙ্গে হাসি-মস্করা করতেন।কয়েকজন রক্ষী পরে বার্ডেনওয়ার্পারকে বলেছিলেন যে তারা বিশ্বাস করতেন -‘যদি তাদের কোনও ঝামেলায় পড়তে হয়, তাহলে সাদ্দাম তাদের বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনও বাজি রেখে দিতে পারেন’।

 

২১। যখনই সময়-সুযোগ পেতেন, তখনই সাদ্দাম হোসেন পাহারার দায়িত্বে থাকা রক্ষীদের পরিবারের খোঁজখবর নিতেন।

 

২২। একদিন এক নার্স এসে সাদ্দামকে জানান তাঁর ভাই মারা গেছেন। তখন সাদ্দাম বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি জানান, কোনোদিন যদি তাঁর হাতে টাকা আসে, তাহলে তাঁর (নার্সের) ভাইয়ের সন্তানের সব দায়িত্ব নেবেন তিনি।

 

২৩। বার্ডেনওয়ার্পারের বইটাতে সবথেকে আশ্চর্যজনক যে বিষয়টার উল্লেখ রয়েছে, সেটা হল সাদ্দামের মৃত্যুর পরে তাঁর প্রহরীরা রীতিমতো শোক পালন করেছিলেন, যদিও তিনি আমেরিকার কট্টর শত্রু ছিলেন।

 

২৪। প্রহরীদেরই একজন বলেছিলেন, সাদ্দামের ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পরে আমার মনে হচ্ছে আমরা ওর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। নিজেদেরই এখন তার হত্যাকারী বলে মনে হচ্ছে। এমন একজনকে মেরে ফেললাম আমরা, তিনি যেন আমাদের খুব আপনজন ছিলেন।

 

২৫। সাদ্দামের প্রবল বিশ্বাস ছিল যে তার ফাঁসি হবে না।

 

২৬। ২০০৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর তিনটে নাগাদ ঘুম থেকে ডেকে তোলা হয়েছিল। তাঁকে জানানো হয়েছিল যে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফাঁসি দেওয়া হবে। এই কথাটা শোনার পরে সাদ্দামের ভেতরের সব বিশ্বাস ভেঙ্গে পড়েছিল। তিনি চুপচাপ গোসল করে ফাঁসির জন্য তৈরি হয়ে নিয়েছিলেন।

 

২৭। সেই সময়েও তাঁর একটা ভাবনা ছিল। জানতে চেয়েছিলেন, সুপার টুয়েলভের সদস্যরাও কি ঘুমোচ্ছে?

বিষন্ন সাদ্দাম হোসেইন
বিষন্ন সাদ্দাম হোসেইন

 

 

২৮। ফাঁসির কয়েক মিনিট আগে স্টিভ হাচিনসনকে কারাকক্ষের বাইরে ডেকে পাঠান সাদ্দাম হোসেন। লোহার শিকগুলোর মধ্যে দিয়ে হাতটা বের করে নিজের রেমন্ড ওয়েইল হাতঘড়িটা দিয়ে দেন স্টিভকে। হাচিনসন আপত্তি করেছিলেন। তবে সাদ্দাম কিছুটা জোর করেই ঘড়িটা স্টিভের হাতে পরিয়ে দেন।জর্জিয়ায় হাচিনসনের বাড়ির একটা সিন্দুকে রাখা ঘড়িটা এখনও টিক টিক করে চলছে।

 

২৯। সাদ্দামকে এক রকম ভালোবেসেই ফেলেছিলেন তাঁর পাহারায় থাকা ১২ আমেরিকান কারারক্ষী। আর তাই যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হওয়া সত্ত্বেও ইরাকের সাবেক এই প্রেসিডেন্টের ফাঁসির দিন খুবই কষ্ট পেয়েছিলেন তাঁরা।

 

৩০। ফাঁসির পর সাদ্দামের মৃতদেহ বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন লোকজন মৃতদেহে আঘাত করা শুরু করে। এতে হতভম্ভ হয়ে পড়েন ওই ১২ কারারক্ষী। এক রক্ষী এগিয়ে যান তাদের থামাতে। কিন্তু অন্যরা তাঁকে থামিয়ে দেন।

 

 

 

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *